1. admin@dainiktrinamoolsangbad.com : admin :
রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:০০ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
পাথরঘাটায় পূজা মন্ডপে  আর্থিক সহায়তা করেন “সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার” ভাণ্ডারিয়ায় পূজা পরিদর্শন করেন পিরোজপুরের”জেলা প্রশাসক” সুইস ব্যাংকের টাকা ফেরত পেলে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করব ৫০০ কোটি টাকা পুলিশকে দেব “মুসা” ভাণ্ডারিয়ায় সমবায়ীদের নিয়ে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষণ একাত্তরের চিহ্নিত রাজাকার  আমির হোসেন পালিয়ে কবরে ফেসবুক ৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকায় ৫২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সাগর মোহনায় মা ইলিশ ধরার অপরাধে ১৪জেলেকে কারাদণ্ড দেশের জেলেরা “২২দিনের বন্দী” উম্মুক্ত ভারতীয় জেলেরা! শেষ শ্রদ্ধায় “জাতীয় পার্টির মহাসচিব “বাবলু” নাসির-তামিমার “বিয়ে অবৈধ” আদালতে হাজিরের নির্দেশ

বেদনার স্মৃতি ‘৩২ নম্বর বাড়ি’ এখনো অধরা পাঁচ খুনি

এইচ এম জুয়েল
  • আপডেট সময় : রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১
  • ৯৫ বার পঠিত

বেদনার স্মৃতি ৩২ নম্বর বাড়ি

এখনো অধরা পাঁচ খুনি

  এইচ এম জুয়েল:- ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি বেদনার স্মৃতি জাদুঘর হিসবে সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত একটি দিন। ’১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর চক্রান্তে তাদের এ দেশীয় অনুচরেরা হত্যা করে বাঙালি জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সকল সদস্য কে। নিষ্ঠুরতার এ হত্যাকাণ্ডের কাছে পৃথিবীর বড় বড় ট্র্যাজেডিও ম্লান হয়ে যায়।

পরিবার হারনো শোকের বেদনা বুকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ইতিহাসে চিহ্নিত কালো ওই অধ্যাদেশ বাতিলের পর জাতির পিতার খুনের বিচারের পথ খোলে।

এরমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার তখনকার জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আপিলের রায়ে এই ১৫ জনের মধ্যে তিনজন খালাস পান। যে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে উচ্চ আদালত, তাদের একজন আজিজ পাশা পলাতক থাকা অবস্থায় দেশের বাইরে মারা যান বলে খবর আসে।

বাকি ১১ জনের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ, মহিউদ্দিন আহমদ, এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন বন্দি অবস্থায় আদালতে রিভিউ আবেদন করলে তা খারিজ হয়ে যায়। এরপর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ওই পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয় ঢাকার কারাগারে। বাকি ছয়জন পলাতক থেকে যান।

তার প্রায় ১০ বছর পর এ বছরের ৭ এপ্রিল ভোরে পলাতক ৬ জনের একজন ৭২ বছর বয়সী মাজেদকে ঢাকার গাবতলী থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়।

এদিকে বাকি পাঁচ খুনি এখনো পলাতক রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত পলাতক পাঁচ খুনির মধ্যে এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছেন। বাকি তিনজনশরিফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন খান খন্দকার আব্দুর রশিদ কোথায় আছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই

‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই…’-আবেগ আর দরদভরা গানটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বাজানো হয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির আশপাশে গেলেই গানটি অজানতেই মনে বারবার বেজে ওঠে।বঙ্গবন্ধুর শরীর ১৮টি গুলিতে  ঝাঁঝরা হয়ে যায়

১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর পরিবার-পরিজন নিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাড়িটিতে উঠেন। রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সবুজঘেরা তিনতলা সাদা রঙের বাড়িটি যেন শান্তির প্রতীক। প্রবেশ করতেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। বাড়িতে নিচতলায় ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি, দ্বিতীয় তলায়ও পাঁচটি রুম এবং তৃতীয় তলায় দুটি কক্ষ রয়েছে। পেছনের দিকে রান্নাঘর এবং পাশে কবুতরের ঘর। বাড়িটি নির্মাণের সময় একতলায় মাত্র দুটি শয়নকক্ষ ছিল। একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন। ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় তলায় তার বসবাস শুরু হলে কক্ষটি গ্রন্থাগার হিসাবে ব্যবহার করতেন বঙ্গবন্ধু। উত্তর পাশের লাগোয়া কক্ষে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থাকতেন। এ কক্ষেরই একপাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। কিন্তু সেসব আজ ইতিহাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্তে বাড়িটি ভেসে যায়। ঘাতকদের বুলেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব (বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী), শেখ কামাল (বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র), শেখ জামাল (বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র), শেখ রাসেল (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র), শেখ আবু নাসের (বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ছোট ভাই), সুলতানা কামাল খুকু (শেখ কামালের স্ত্রী), পারভীন জামাল রোজী (শেখ জামালের স্ত্রী) প্রাণ হারান। বিশ্বের ইতিহাসে ঘৃণ্যতম এ হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের আটজনসহ মোট ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়।

বর্তমানে বাড়িটি দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন বেশ কয়েকজন। তারা জানান, ২০১১ সালের ২০ আগস্ট বাড়ির উত্তরে সম্প্রসারিত ভবন তৈরি করা হয়। ভবনটির ষষ্ঠ তলায় ২৬টি পর্বে বঙ্গবন্ধুর তথ্য ও সচিত্র ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সংগ্রামী জীবন তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি বাড়িটি ঘুরে দেখিয়েছেন একজন কেয়ারটেকার। তিনি যখন বাড়িটি সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন তার চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে উঠছিল। তার চোখে-মুখে শোকের ছায়া দেখা যায়। কক্ষে কক্ষে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র রয়েছে। প্রতিটি কক্ষেই গুলির চিহ্ন, রক্তের ছাপ। সিলিংয়েও রক্তের সঙ্গে মগজের ছাপ। নিচতলার যে সিঁড়িতে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে রক্তের ছাপ এখনো লেগে আছে। নিচতলায় বঙ্গবন্ধুর লাইব্রেরিতে অসংখ্য বই। দেওয়ালে দেওয়ালে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং অতিথিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তোলা ছবি টাঙানো রয়েছে।

 

রিলিফের কাপড়ে কাফন ৫৭০ সাবানে গোসল

১৯৭৫-এর ১৬ আগস্ট। এ দিন ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে দুপুরে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ এসে পেঁৗছায়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে কফিন নামিয়ে টুঙ্গিপাড়া সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজার কাসেম, ক্যাশিয়ার (নাম জানা যায়নি), আবদুল হাই মেম্বার, আকবর কাজী, মো. ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরুল হক গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ কয়েকজন তার পৈতৃক বাড়িতে লাশ বহন করে আনেন। কফিন খুলে লাশ বের করে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করানো হয়। রেড ক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হয়।বাংলাদেশের স্থপতি তিনি। দেশের মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রাম করা এই মানুষটি যেভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সেই কালিমালিপ্ত ইতিহাস দেশের মানুষকে বয়ে বেড়াতে হবে কালে কালে। অথচ মৃত্যুর পর স্বাধীন বাংলার এই স্বপ্নদ্রষ্ট্রার দাফনের আগে গোসল হওয়া নিয়েই ছিলো চরম সংশয়। কারণ যেসব অমানুষ জাতির জনককে হত্যা করে কলঙ্কিত করেছে ইতিহাসকে, তাদের পরিকল্পনায় ছিলো যত দ্রুত সম্ভব বঙ্গবন্ধুর মরদেহ দাফন করা যায়। তাদের ভয় ছিল মানুষের ক্রোধ স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারে যে কোনো সময়ে। তাই কুলাঙ্গারদের পরিকল্পনা ছিলো, লাশ গোসল ছাড়াই কবরে নিয়ে যাওয়ার। সে অনুযায়ী কবরও খুড়ে ফেলা হয়েছিলো। কিন্তু একজন কাজী সিরাজুল ইসলাম তা হতে দেননি। বাংলাদেশ পুলিশে তৎকালে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত এই সাহসী মানুষ বঙ্গবন্ধুর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, ‘মরদেহের গোসল করাতে হবে।’ আর তিনিই তা করাতে চান। এরপর কাজী সিরাজুল অসীম সাহস নিয়ে পরম মমতায় জাতির জনককে গোসল করালেন। নিজেই নামলেন কবরে। সেখানেও যত্নসহকারে নিয়ে মরদেহ পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুনের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মরহুম মৌলভী আবদুল হালিম। দাফন অনুষ্ঠানে টুঙ্গিপাড়া, পাটগাতী ও পাঁচকাহনিয়া গ্রামের ৩০-৩৫ জন অংশ নেন।

সেই কালো রাতে যা ঘটেছিল

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী (রেসিডেন্ট পি এ) জনাব আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম এর এজাহারে বর্ননানুসারে)

১৯৭৫ সালে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। ১৪ আগষ্ট (১৯৭৫) রাত আটটা থেকে ১৫ আগষ্ট সকাল আটটা পর্যন্ত তিনি ডিউটিতে ছিলেন ওই বাড়িতে। ১৪ আগষ্ট রাত বারোটার পর ১৫ আগষ্ট রাত একটায় তিনি তাঁর নির্ধারিত বিছানায় শুতে যান।

মামলার এজাহারে জনাব মোহিতুল উল্লেখ করে বলেন, ‘তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল নেই। হঠাৎ টেলিফোন মিস্ত্রি আমাকে উঠিয়ে (জাগিয়ে তুলে) বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা কী পাঁচটা। চারদিকে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ফোনে আমাকে বললেন, সেরনিয়াতের বাসায় দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করেছে। আমি জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পরও পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন পাচ্ছিলাম না। তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে এসে আমার কাছে জানতে চান পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন কেউ ফোন ধরছে না। এসময় আমি ফোন ধরে হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। এসময় দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাঁক গুলি এসে ওই কক্ষের দেয়ালে লাগল। তখন অন্য ফোনে চিফ সিকিউরিটি মহিউদ্দিন কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। গুলির তান্ডবে কাঁচের আঘাতে আমার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এসময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়েন। আমিও শুয়ে পড়ি।

কিছুক্ষণ পর সাময়িকভাবে গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ওপর থেকে কাজের ছেলে সেলিম ওরফে আবদুল বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবী ও চশমা নিয়ে এলো। পাঞ্জাবী ও চশমা পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে তোমরা কি কর? এসময় শেখ কামাল বলল আর্মি ও পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। কালো পোশাক পরা একদল লোক এসে শেখ কামালের সামনে দাঁড়ালো। আমি (মোহিতুল) ও ডিএসপি নূরুল ইসলাম খান শেখ কামালের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নরুল ইসলাম পেছন দিক থেকে টান দিয়ে আমাকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেল। আমি ওখান থেকে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি গুলির শব্দ শুনলাম। এসময় শেখ কামাল গুলি খেয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়লেন। কামাল ভাই চিৎকার করে বললেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, ভাই ওদেরকে বলেন।’

মোহিতুল ইসলামের এজাহারের বর্ণনায় বলেন, ‘আক্রমণকারীদের মধ্যে কালো পোশাকধারী ও খাকি পোশাকধারী ছিল। এসময় আবার আমরা গুলির শব্দ শোনার পর দেখি ডিএসপি নূরুল ইসলাম খানের পায়ে গুলি লেগেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম আক্রমণকারীরা আর্মির লোক। হত্যাকান্ডের জন্যই তারা এসেছে। নূরুল ইসলাম যখন আমাদেরকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন তখন মেজর বজলুল হুদা এসে আমার চুল টেনে ধরলো। বজলুল হুদা আমাদেরকে নিচে নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড় করালো। কিছুক্ষণ পর নিচে থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ শুনলাম। বিকট শব্দে গুলি চলার শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। শুনতে পেলাম মেয়েদের আত্মচিৎকার, আহাজারি। এরইমধ্যে শেখ রাসেল ও কাজের মেয়ে রুমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে মারবেনাতো। আমি বললাম না তোমাকে কিছু বলবে না। আমার ধারণা ছিল অতটুকু বাচ্চাকে তারা কিছু বলবে না। কিছুক্ষণ পর রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রুমের মধ্যে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর মেজর বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে বলে, অল আর ফিনিশড।’

অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেন, খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই বাসভবনে অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল রশিদ দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গভবনে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডালিম ছিলেন বেতার কেন্দ্রে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বন্টন করেছেন তিনি (ফারুক) নিজেই।

ছোট্ট রাসেলের শেষ আকুতি টলাতে পারেনি খুনীদের মন

“আল্লাহ’র দোহাই আমাকে জানে মেরে ফেলবেন না। আমার হাসু আপা দুলাভাইয়ের সঙ্গে জার্মানীতে আছেন। আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আপনারা আমাকে জার্মানীতে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিন” মৃত্যুর আগে খুনীদের কাছে এই আকুতি ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের। তবে সেদিন রাসেলের এই আর্তচিৎকারে খোদার আরশ কেঁপে উঠলেও টলাতে পারেনি খুনী পাষাণদের মন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মত এই নিষ্পাপ শিশুকেও পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছিল।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে রাসেলকে হত্যার এই নৃশংস বর্ণনা দিয়েছেন। এম এ ওয়াজেদ মিয়া তার গ্রন্থে লেখেন বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে হত্যার পর রাসেল দৌড়ে নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো বাড়ির কাজের লোকজনের কাছে আশ্রয় নেয়। রাসেলের দীর্ঘকাল দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা আবদুর রহমান রমা তখন রাসেলের হাত ধরে রেখেছিলেন। একটু পরেই একজন সৈন্য রাসেলকে বাড়ির বাইরে পাঠানোর কথা বলে রমার কাছ থেকে তাকে নিয়ে নেয়। রাসেল তখন ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে তাকে না মারার জন্য আল্লাহ’র দোহাই দেয়।

রাসেলের এই মর্মস্পর্শী আর্তিতে একজন সৈন্যের মন গলায় সে তাকে বাড়ির গেটে সেন্ট্রিবক্সে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এর প্রায় আধ ঘণ্টা পর একজন মেজর সেখানে রাসেলকে দেখতে পেয়ে তাকে দোতলায় নিয়ে ঠান্ড মাথায় রিভলবারের গুলিতে হত্যা করে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র দুরন্তপ্রাণ শেখ রাসেল এমন সময়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন যখন তার পিতার রাজনৈতিক জীবনকে দেখতে শুরু করেছিলেন মাত্র।

শেখ রাসেলকে হত্যার আগে ঘাতকরা একে একে পরিবারের অন্য সদস্য বড় ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, মা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এবং বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। ১৯৬৪ সালের ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই শেখ রাসেল ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২০ দৈনিক তৃণমূল সংবাদ
Theme Customized BY Theme Park BD