1. admin@dainiktrinamoolsangbad.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :

মেজর জিয়াউদ্দিনের সংগ্রামী জীবন “অতৃপ্ত রয়েগেল!

এইচ এম জুয়েল
  • আপডেট সময় : বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১
  • ৭৭৪ বার পঠিত

বীরসেনানী মেজর জিয়াউদ্দিনে

 সংগ্রামী জীবন অবশেষে অতৃপ্ত রয়ে গেল

 এইচ এম জুয়েল:- মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তী বীরসেনানী মেজর জিয়াউদ্দিনের জীবদ্দশায় বীর প্রতীক খেতাব ও চাকরির পদমর্যাদা না পাওয়ায় জীবনে অতৃপ্ত রয়েগেল।

৭১ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্রুত সংঘটিত করতে ৯ম  সেক্টার কমান্ডার মেজর জলিলের নেতৃত্বে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মেজর জিয়াউদ্দিন নিজ জীবন বাজি রেখে ভারত থেকে অস্ত্র এনে মুক্তিবাহীনি তৈরি করে, তাদের নিয়ে সুন্দরবনে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটি তৈরি করে। পিরোজপুর এবং বাগেরহাটের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অপারেশন চালিয়ে পাকসেনাদের পরাজিত করে, এলাকা লে.জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে অনেকটাই মুক্তঞ্চলে পরিণত হয়।

স্বাধীনতার পর আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে গিয়ে  মেজর পদমর্যাদা হিসেবে (ডিজিএফআই) ঢাকা ডিটাচমেন্টের অফিসার ইন চার্জ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় কিছু বিপথগামী সেনা কর্তিক বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তারই রেশ ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লবে পক্ষে অবস্থান নিলে। সেনাপ্রধান তাঁকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে চাকরি চুক্ত করেন। পরে তাকে সামরিক কোটে সাজা দেওয়া পর। আবার তাকে ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

পরে পরিবেশ অনুকূলে আসলে জিয়াউদ্দিন ন্যায্য  হিস্যা আদায়ের জন্য – উচ্চ-আদালতে  চাকরির (খেতাব) পদমর্য়াদা ও বেতন ও পেনশন ফিরে পেতে রিট করলে উক্ত আদালত তার পক্ষে রায় দিয়ে খেতাব, বেতন/ পেনশনের টাকা ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদেশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদালতের রায় বাস্তবায়ন আজও করেনি।

এদিকে চির বিদায়কালে লালিত স্বপ্ন মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক খেতাব ও চাকরির পদমর্যাদা বেতন/পেনশনের টাকা দেখে যেতে পারলেন না সাব-সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি বীরসেনানী মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন ।

তার সন্তানদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি  দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে আমার বাবা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে । বাবার পক্ষে আদালতের রায় বাস্তবায়ন করে  বীরসেনার আত্মার শান্তি ও আমাদের পরিবার কে স্বাবলম্বী করুন।

আজ ২৮তাং ছিলো বীরসেনার ৪ মৃত্যুবার্ষিকী  উপলক্ষে পিরোজপুরের সীমিত আকারে পরিবারের পক্ষ থেকে সমাধিতে পুস্প  অর্পণ  দোয় ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।

বল বীর বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর।   মেজর জিয়াউদ্দিন বরাবরই ছিলেন এদেশের রাজনৈতিক শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। মিডিয়া, সভা-সেমিনারে দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন সমাজ পরিবর্তনের কথা। চেয়েছিলেন শোষককে পরাজিত করে নতুন সমাজ নির্মাণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণে সৈনিক জীবনের চলার পথে বিপ্লবের পথকেই মুক্তির পথ হিসেবে আকড়ে ধরেছিলেন। তার শোবার ঘরে সবসময় শোভা পেত বিপ্লবি চে-গুয়েভারা ছবি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সুশীল সমাজের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি, এই বিপ্লবী বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে কঁচা নদী উপর নির্মাণাধীন সেতু টি মেজর জিয়াউদ্দিন সেতু, নামকরণ করা হোক। এবং তার সমাধি স্থল বাসভবনে একটি কক্ষে তার ব্যবহৃত স্মৃতি গুলো সংরক্ষন করে মিনি জাদুঘর ও পাঠাগার তৈরি করা হোক।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:-পিরোজপুরের পুর্ব ভাণ্ডারিয়া সম্ভান্ম মুসলিম মিঞা বংশের (দাদা) মোঃ মহশেন উদ্দীন মিঞা জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দীন আহমেদ মিঞা সপরিবারে পিরোজপুরে এসে আইন পেশা শুরু করেন। এবং পিরোজপুর পৌরসভার একাদিক বার চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তার ৫ পুত্র-৩ কন্যার মধ্য “আলী হায়দার জিয়াউদ্দিন আহমেদ” সেজো পুত্র।

জিয়াউদ্দিন ১৯৫০সালে  পিরোজপুরে জন্মগ্রহন করেন শৈশবে মেধাবী দুরন্ত সাহসী ছেলেটি ক্রিকেট খেলায় পারদর্শী ছিলেন। গভঃ স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে  পিরোজপুর মহকুমা (ভাসানীর ন্যাপ) ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হলেন। এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের সেই উন্মাতাল দিনগুলি:- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রারম্ভে মার্চ মাসের ২০ তারিখ তিনি ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। এবং যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে প্রথমে তিনি পিরোজপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। নবম সেক্টরের অধীনে সুন্দরবনে ঘাঁটি স্থাপন করে

,উপ-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ১৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে শত্রুদমনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ উপাধি দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ব্যারাকে ফিরে যান এবং মেজর পদমর্যাদা হিসেবে (ডিজিএফ আই) অফিসার পদে যোগ দেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জীবন:-১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু যখন কিছু বিপথগামী  সামরিক বাহিনীর হাতে সপরিবারে নিহত হন তখন মেজর জিয়াউদ্দিন ডিরেক্টরেট অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ঢাকা ডিটাচমেন্টের অফিসার ইন চার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ নির্মম হত্যা কোনোভাবেই তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তারই রেশ ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে  লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহেরের পক্ষ অবলম্বন করলে, সেনাপ্রধান তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে চাকরীচ্যুত করলেন । পরবর্তীতে তিনি সিপাহি জনতার বিপ্লবে কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থার পক্ষে অবস্থান ও তার অনুসারীদের নিয়ে সুন্দরবনে আশ্রয় নেন।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে সেনা অভিযানে মেজর জিয়াউদ্দিন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে গ্রেফতার হন। ১৯৭৬ সালে বিশেষ সামরিক ট্রাইবুনালে সামরিক প্রশাসনের গোপন মামলায় সামরিক আদালতে  গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি ও আ স ম আবদুর রব, মেজর  জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ নিয়ে তখন সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন শুরু করলে আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি লাভ করেন। তবে তার মুক্তির পিছনে চাচাতো ভাইয়ের ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের অনেক অবদান ছিল। এবং ১৯৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় মেজর জিয়াউদ্দিন দেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুরে আশ্রয় নেন।

রাজনৈতিক ও কর্ম জীবন:-১৯৮৪ সালের অক্টোবরে তৎকালীন জাতীয় পার্টি প্রথম সারির মন্ত্রী তার আপন চাচাতো ভাই মানিক মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সহযোগিতায় সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ছোটভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুঁটকি মাছের ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৮৭ সালে তিনি পিরোজপুর উপকন্ঠে বাবার নামে আফতাব উদ্দিন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৮৯-৯১ সালে বিপুল ভোটে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

        পরে১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।এস্থানিও জেলে ও প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে সুন্দরবনের ডাকাতদের নির্মূলের অবদান রেখেছেন। সেখান কার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন।   “বনের রাজা টারজান” তিনি জেলেদের রক্ষা করতে গিয়ে একাধিকবার বনদস্যু ডাকাতদের হামলার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ  ২০১৩ সালে খুলনা থেকে সুন্দরবনের দুবলার চরে যাওয়ার সময় চরাপুটিয়া এলাকায়  সুন্দরবনে বনদস্যু মোর্তজা বাহিনীর গুলিতে জিয়াউদ্দিন আহমেদ আহত হন। এ সময় দুই পক্ষের গুলিবিনিময়ে ৪ দস্যু নিহত হয়। আহত জিয়াউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার পাঠিয়ে উন্নত চিকিসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে একটি অরোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালে ২৮ জুলাই সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

এবং ৩০ জুলাই সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্যে এই বীরযোদ্ধার মৃতদেহ জাতীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করে। সবশেষ পিরোজপুরে শেষ জানাযায় প্রায় লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। উক্ত জানাযায় তার  চাচাতো ভাইয়ের ছেলে তৎকালীন মন্ত্রী বর্তমান এমপি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মুক্তিযোদ্ধা- রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পরে ১ আগস্ট তাঁকে পরেরহাট সড়কের বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবন:- জিয়াউদ্দিন আহমেদ একজন লেখক ও সাংবাদিক ছিলেন। তিনি মঠবাড়িয়ার কন্যা কানিজ মাহমুদাকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের সংসারে চার সন্তান দুই পুত্র দুই কন্যা রেখে খেছেন।

প্রকাশনা:-মুক্তিযুদ্ধে নিজের ও অন্যান্যদের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি “মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের উন্মাতাল দিনগুলি” নামে একটি বই লিখেছেন। যেটা মুক্তিযুদ্ধের একটি জীবন্ত দলিল।

 

 

এ জাতীয় আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২০ দৈনিক তৃণমূল সংবাদ
Theme Customized BY Theme Park BD